গল্প- অবৈধ বিয়ে পর্ব ৬

 বের হয়ে দেখি ইকবাল এর মা -বাবা আর দুজন মহিলা বসা..

এর মাঝে একজন বৃদ্ধা মহিলা..
সে বক বক করেই যাচ্ছে।
"আরে বিয়ের পর মেয়েরা ঘুম দিয়া উঠে সবার আগে।
শ্বশুর -শাশুড়ির খেদমত করে আর ইকবাল এ কি বিয়া কইরা আনছে?ওরে বললাম আসমারে বিয়া করতে..আসমা কত গুনি মাইয়া..
ইকবাল এর মা-বাবা কিছুই বলছেননা,কে এই মহিলা তাও আমি জানিনা...
আমি পাশে গিয়ে দাড়ালাম...
ইকবাল এর মা বলছে,বউ এই তোমার নানী শাশুড়ি আর এই তোমার খালা শাশুড়ি..
আমি সালাম দিলাম..
নানী : এ মা... বউ পর পুরুষ এর সামনে মাথায় কাপড় দিয়া আসতে হয় তাও জানো না?
আমি: পরপুরুষ কে?
নানী : কেন তোমার শ্বশুর..
আমি: বাবা আবার পরপুরুষ কি করে হয়?
ইকবাল এর বাবা আমার দিকে তাকালো..তার মুখ দেখে মনে হচ্ছে সে খুশি হয়েছে যদিওবা আমি তাকে খুশি করার জন্য বলিনি..
নানী : তো শহরের মাইয়া..দেখলে তো ছোট মনে হয় তাইলে এতো তাড়াতাড়ি বিয়া করলা কেন?
তার একটা কথায় আমার বুকে ভিতর মোচর দিল
আমি কি বিয়ে করতে চেয়েছিলাম..আমার পক্ষে কি এতো কিছু মেনে নেয়া সম্ভব ছিল,তবে পরিস্থিতি সব সম্ভব করে দিয়েছে।
আমি তার কথায় আর উত্তর দিলাম না।
বাবা: আম্মা থাক যা হবার হয়েছে,ইকবাল খুশি থাকলেই আমরা খুশি।
নাটক -সিনেমায় দেখতাম শাশুড়িরা বউকে নির্যাতন করে..
আর এখন দেখছি নানী শাশুড়ি ও।
আমার ঘর বাঁচানোর দায় নেই তাই আমায় কিছু বলুক একবার তাহলে আমিও প্রতিবাদ করবো..
এর মাঝে ইকবাল এর মা বললো চা করে আনতে।
চা আমি করতে পারি।বাসায় আমি ই চা করতাম সবসময় তাই কাজটা আমার অপছন্দ নয়...
কিন্তু এখানে যে উঁনুন তাতে আমি করতে কিছুটা ভয় পাচ্ছি।
ইতি আসলো আমায় সাহায্য করতে..
মেয়েটা যেন আমার অনেক দিনের আপনজন।
আমি ফিস ফিস করে জিজ্ঞেস করলাম ইতি আসমা কে?
ইতি কিছুক্ষন চুপ করে রইলো।
আমি: না বলতে চাইলে থাক..
ইতি: আমার খালাতো বোন..নানির পাশে যে খালা বসা তার মেয়ে।ভাইয়ার সাথে বিয়ে দিতে চাইছিল।
আমি: তারপর?
আমি জানিনা আমার কেন এতো কৌতুহল হচ্ছে?ইকবাল এর বিয়ে না যেন যা ইচ্ছে তাই হোক তাতে আমার কি?
ইতি: আব্বা বলছিল ভাইয়া চাকরি করবে তারপর।
আসমা আপু খারাপ না ভাবি,ভাইয়ার সাথে কিছুই ছিলনা তুমি আবার ভাইয়াকে ভুল বুঝোনা।
আসমা আপুও আসছে,হয়তো সামনেই আছে...
আমি: তোমার ভাইয়াকে দেখছো?
ভাবছি,হয়তো আসমার সাথে দেখা করতে গেছে।যাক তাতে আমার কি?উনি আমার কেউ নন শুধুই আজ আমার অবস্থা আমার পক্ষে নেই তাই।
ইতি:ভাইয়া বাড়ি যতক্ষণ থাকে ঘরে থাকে শুধু রাতে।সারাদিন ঘুরে বেড়ায়।নামাজ পড়ার পর আর আসেনি।
সবাইকে চা দিয়ে আমি রুমে গেলাম।
মাঝে মাঝেই বিভিন্ন মানুষ আসে আমায় দেখতে,কি অদ্ভুত মনে হচ্ছে ভিন্ন গ্রহ থেকে এলিয়েন এসেছি তাই জনে জনে আমায় দেখতে আসছে।
দুপুর হয়ে গেল ইকবাল সাহেবের খবর নাই...
আমি কানে ইয়ার ফোন লাগিয়ে গান শুনছি..
এর মাঝেই রুমে এসে নানীর
চিৎকার..
বউ এর কি লজ্জা নাই..?
ঘরের বউ থাকবে বউ এর মতন,তা না সে কানে তার লাগাইয়া শুয়ে আছে..
আমাগো বিয়ার সময় লজ্জায় ৩মাস মাথা উঁচু ই করিনাই..
এই বলে চলে গেল..
আমি ওনার কথা বসে বসে শুনেছি..
কিছুই বলতে পারিনি..
ইকবাল আমায় একা রেখে চলে গেল।অবশ্য যাবে নাই বা কেন! কে আমি?আমায় তো সে দয়া করেছে...
আমি কাঁদছি মহিলার কথা শুনে নয়..
কথা শুনতে আমার অভ্যাস হয়ে গেছে...
কাঁদছি আমার কপালের কথা ভেবে..
এর মাঝে ইতি এসে বলে,ভাবি তুমি ওনার কথায় মন খারাপ করোনা।উনি ওমন ই..
আমি: তোমার ভাই কি এলো?
ইতি :না
ইতি আসমার সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দিল।কেন যেন এই আসমা মেয়েকে আমার হিংসা হয়।কেন যেন এই মেয়েকে আমি সহ্য করতে পারিনা।
আসলে আমি কি চাই বা কি চেয়েছিলাম সব ই আমার অজানা তেমনি অজানা আমি কি করবো সেটা..
সন্ধ্যা হয়ে গেল ইকবাল এখনো আসছেনা..
কিছুক্ষন পরে বাহির থেকে কে যেন জানালায় টোকা দিল..
আমি সেটা আবার শোনার জন্য জানালার পাশে গিয়ে দাড়ালাম
আবার টোকার শব্দ এক সময় জিজ্ঞেস করলাম কে?
ওপাশ থেকে ইকবাল ধীর গলায় বলছে,আমি,লুবনা জানালা খুলুন।
ভাবছি আমিও আধা ঘন্টা পর জানালা খুলবো।অপেক্ষা করার কষ্ট বুঝুক।
জানালা খুলে দেখি দাড়িয়ে আছে।
আমি: এখান দিয়ে রুম এ আসবেন কি করে?
সামনের দরজা দিয়ে আসুন।
ইকবাল: আমার হাতে একটা প্যাকেট দিয়ে বললো এই নিন।
আমি: কি এটা?
ইকবাল: জিলাপি । আমাদের এখানে খুব ভালো বানায়..
আমি: বাসার সবাইকে দিব?
ইকবাল: না এটা শুধু আপনার। বাসার কাউকে দেখাবেন না।
আমি: ইতি কে ছাড়া খাব না।
ইকবাল: ওর জন্য এনেছি।আমি দিয়ে দিব।
আমি জানিনা সে কেন আমায় আলাদা দিল।তবে আমি তার কথা মতই লুকিয়ে রেখেছি খাবার..
এর মাঝে ইকবাল আসলো ঘরে।
ইকবাল এর নানী ইকবাল কে জড়িয়ে ধরে আবার কাঁন্না।
এখানে রিতি এমন ই হয়তো,ছেলেরা বিয়ে করলেই তারে জড়িয়ে ধরে কাঁদে।আর মেয়েদের না আছে হাসা বা না আছে কাঁদার অধিকার।
ইকবাল এর মা ইকবাল কে বলছে,নতুন বউ ঘরে একা রেখে কই ছিলি সারাদিন?
ইকবাল: কেন তোমরা আছোনা?
ইতি এই নে জিলাপি ।
ইতি: ভাবির হাতে দে।
নানী : বিয়ে হতে না হতেই বউর হাতে সব দিলে বউ মাথায় উঠে নাচবে।
তোদের নানা আমায় প্রশ্রয় দিতনা।
বউ আশ্রয় দেবার জিনিস,প্রশ্রয়না।
ইতি তবুও জিলাপি এনে আমার হাতে দিল।
আমি: ইতি তুমি খাও।আমি খাইনা বলে ইকবাল এর দিকে তাকিয়ে দেখি সে আমার দিকে তাকিয়ে আছে...
এর মাঝেই আসমা এসে বলে,ভাবি মনে হয় রাগ করছে যাও ইকবাল ভাইয়া বউ এর মান ভাঙাও।
ইকবাল এর মা: ইকবাল বিয়ে কইছিস তাই যা আনবি বউ কে দিবি।আজকালকার বউরা অনেক কিছুই আশা করে। আগের যুগ আর নাই এখন।
এক খাবার নিয়ে এতো কাহিনী এ ঘরে,এর জন্যই আলাদা আমায় দিয়েছে।
ইকবাল রুমে গেল তারপর আমিও গেলাম.
শুনছি আসমা বলছে,বর কে চোখে হারাচ্ছে।
আমি কানে নিলামনা।
ইকবাল : খেয়েছেন?
আমি ওর কথার উত্তর দিলাম না.
সারাদিন কই ছিলেন?
ইকবাল: মসজিদ এ ঘুমিয়ে ছিলাম।রাতে ঘুম হয়নি।
আমি: আপনার ঘর নাই?
ইকবাল: মসজিদে ঘুমাতে শান্তি আছে অনেক।
আসলে,ঘরে তো অশান্তি অনেক আর তা হলাম আমি। সেটা আমি খুব বুঝি ইকবাল বলুক আর না বলুক।
ইকবাল: আমার বাসার কারো কথায় কিছু মনে করবেন না।
আমি: আসমা কে?
ইকবাল: আমার খালাতো বোন।
আমি: তা আমি জানি বাকিটা বলুন।
ইকবাল: বাকি কি? আমার খালা আর খালুর মেয়ে।
ইকবাল আমায় হয়তো বলতে পারছেনা বা চাইছেনা। আমার ও উচিৎ না কারো পার্সনাল বেপার নিয়ে খোঁচানো...
আমি: তা কি ভাবছেন?
ইকবাল: কি?
আমি: আমরা এখান থেকে যাব কবে?
ইকবাল: আমি ২-১দিন পর ই যাব। আপনাকে মা মনে হয় এতো তাড়াতাড়ি যেতে দিবেনা।
আমি: মানে?
ইকবাল: হুম নতুন বউকে এখনো অনেকের দেখা বাকি।
আমি: কিসের বউ বউ করছেন আপনি?
তারা না হয় জানেনা?
আপনি তো জানেন?
এ বিয়ে অবৈধ,এ বিয়েতে আমার মত ছিলনা,এ বিয়ে আমি চাইনি..
আপনি কি ভাবছেন আমি সব মেনে নিয়েছি?
আচ্ছা আমার সাথে আপনাকে যায়??
এমন ঘরে থাকা যায়? সবাই খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে কথা বলে।বিয়ের কাজ বিয়ে করেছি।চলেও যাব সময় মত।
ইকবাল কোন কথা না বলে রুম থেকে চলে গেল।
আমি জানিনা এসব আমি কেন বলছি।ইকাবাল এর প্রতি রাগ এর কারন টা শুধু বুঝতে পারছি তা হল আসমা।কিন্তু সেই রাগের কারনটা আমি মানতে পারছিনা।নিজের মনের প্রতি নিজের ই লজ্জা লাগছে।
আজ রাতে আর ঘুমাবোনা। সকাল-সকাল উঠে আমি ই আজ সবাইকে নামাজ পড়তে উঠাবো।
নানীর মুখ এ ছাই দিব আমি।
রাতের খাবার শেষ করে আমি এসে শুয়ে শুয়ে গান শুনছি।বাবা-মায়ের কথা মনে পরছে।আসার পর তাদের সাথে একটু কথাও বলিনি।ইচ্ছে করেই বলিনি,রাগ- অভিমানে..
বাবা-মা চিন্তায় ই শেষ হয়ে যাচ্ছে হয়তো..
এর মাঝে ইকবাল রুমে আসলো,আমি ওনার সাথে কথা না বলে অন্য দিক ফিরে শুয়ে আছি।হয়তো সেও কথা বলবেনা।
ইকবাল: কাল রাতে গল্পটা শেষ পর্যন্ত না শুনেই ঘুমিয়ে গেছেন।আজ বাকিটা পড়বো?..
আমি উঠে বসলাম,কেন আপনাকে গল্প পড়তে বলছি?
নিজেই তো টেবিল এর উপর হা করে ঘুমিয়ে পরলেন..আবার বলেন আমি ঘুমিয়েছি।
শুনুন,বিছানায় আসুন।আবার কাল মসজিদ এ গিয়ে ঘুমাবেন তা আমি চাইনা।
ইকবাল বিছানার এক পাশে এসে শুয়ে পড়লো।আমি বসে আছি ইকবাল এর ঘুমের অপেক্ষায়।কিছুক্ষন পর ইকবাল কে বললাম ঘুমিয়ে পরেছেন?
ইকবাল: না..
আমি: আমার না ক্ষুধা লাগছে।সবার সামনে লজ্জায় আমি খেতে পারিনি।
ইকবাল উঠে বসলো কিসের লজ্জা খেতে আবার?দাড়ান দেখছি খাবার আছে কিনা.
আমি: যেতে হবেনা,টেবিল এর ড্রয়ারের মধ্যে জিলাপি আছে আমি তখন খাইনি।
ইকবাল: খান নি কেন?এখন তো ঠান্ডা হয়ে গেছে..
আমি: বারে,আপনাকে রেখে খাব কেন?
দুজন রাতে জিলাপি খাচ্ছি..
ইকবাল: বেশি আনতাম কিন্তু আমার কাছে টাকা ছিলনা..
আমি: বেশি আনলে মজা লাগতো না।
আচ্ছা রাতে ঘুমিয়ে গেলে সকালে উঠতে পারবোনা।তার চেয়ে সারারাত জেগেই থাকি।
ইকবাল: আমি উঠিয়ে দিব ঘুমান।রাত জাগলে দিনেও ঘুমাতে পারবেন না।
বাড়ছে রাত,বাড়ছে ঘুমের নেশা।
ইকবাল আর আমি দুজন দুদিকে ফিরে শুয়ে আছি।
আমি: আচ্ছা জলমানব এর শেষে কি হয়েছিল?.
ইকবাল: নায়িকা জলমানবের সাথে সাগরে চলে গেল..
আমি: নায়িকা সাগরের মাঝে কি করে থাকবে?অক্সিজেন পাবে কি করে? দ্বীপ ঢুবে গেলে মরে যাবেনা?
ইকবাল: গল্পে ভালোবাসাই অক্সিজেন..
আমি হাসি দিয়ে চোখ বন্ধ করলাম।খেজুর আবার ভালোবাসাও বোঝে..
চোখে ঘুম ভর করেছে।চোখের সামনেই এক জলমানব প্রেমিক ভেসে আসছে আর তার নায়িকা হিসেবে নিজেকে মনে হচ্ছে।নায়কটার চেহারা স্পষ্ট বুঝছিনা।ঘুমে ক্রমানয়ে আবছা হয়ে আসছে সব..
ঘুমিয়ে যেতে না যেতেই কানের কাছে ইকবাল ফিস ফিস করে আমার নাম ধরে ডাক দিল..
চলবে...
লিখেছেন: Umme Nipa


Comments

Popular posts from this blog

গল্প- অবৈধ বিয়ে পর্ব ১

তুমিময় অসুখ পর্ব- ১০ (অন্তিম)

তুমিময় অসুখ পর্ব- ৮