গল্প- অবৈধ বিয়ে পর্ব ৪
আমি আর ইকবাল দুজন ই মায়ের দিকে তাকালাম।
ভাবছি মা এসব কি বলছে।জামাই কই দিয়া আসলো।
আপাদত মাথায় কাজ করছেনা।মনে হচ্ছে আমি এক যুগ জেল খেটেছি।ক্লান্ত খুব....
রুবেল: জামাই?
মা: হুম ইকবাল এর সাথে আমার মেয়ের কাবিন হয়ে গেছে দু মাস হলো।
রুবেল: সেটা কেউ জানলোনা?
মা: আমার মেয়ের বিয়ে আমি কারে জানাবো তা তোমায় জিজ্ঞেস করবোনা...
রুবেল: আচ্ছা আমরা আর বিপদে পরলে আসবো না।চলেন আপনারা যাই এখন।
সবাই চলে যাচ্ছে আর বলছে এই ছেলের কথায় আসাই উচিৎ হয়নি।
অনেকে আবার বলছে নাটক দেখলাম ফ্রীতে...
পাশের বাসার আন্টি বলছে ভাবি বিয়া কিন্তু খাওয়া চাই।আবার না বলে উঠিয়ে দিয়েন না।
বাবা!আমরা জানতেই পারলাম না।
সবাই চলে গেছে।ইকবাল আমি আর মা দাড়িয়ে আছি।
এসব কি হচ্ছে সব ই স্বপ্ন লাগছে।
মা: লুবনা ওরা ঘরে ঢুকলো কি করে?
আমি: তুমি যে গেলে দরজা আমি আর লাগাইনি।
আচ্ছা এসব কি বললা তুমি জামাই এর কথা?
ইকবাল: কাকি আমি কাল ই বাসা ছেড়ে চলে যাব। আমাকে আর এই এলাকায় দেখবেন না।
এই ভীতুকে কিনা ভাবছি আমি জঙ্গি।এতো অপমানের চেয়ে ইকবাল আমায় খুন করলে খারাপ হতনা।
মা: এখন তো যাবেই।আমার মেয়ের সর্বনাশ যা হবার তা তো হয়েই গেল বলে মা কেঁদে কেঁদে বসে পড়লো।
আমি: মা উনি কিছু করেনি।আমরা মোম...
মা: চুপ থাক তুই।তুই তোর বাবার মাথা নিচু করে দিলি।তোর বাবা জানলে মরে যাবে।একবার ও ভাবলিনা তুই আমাদের কথা..
আমি: তারমানে তুমি রুবেল এর কথা ই বিশ্বাস করেছো?
মা: শুধু কি রুবেল?
সবাই কি মিথ্যে বলে?
কিছু তো ঘটেছেই...
আমি এতক্ষণ ভয় পেয়েছিলাম,লজ্জা পেয়েছিলাম বাইরের মানুষের কথায়।
তবে এখন চরম আঘাত টা পেলাম।
নিজের মা ই যদি ভুল বোঝে তার চেয়ে অভাগী আর কে আছে।
ইকাবাল মাকে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেনা বা কিছু বলার নাই।
ও বাসা থেকে বের হয়ে গেল...
বাবা আসেনি এখনো। আসলে কিভাবে তার চোখে চোখ রাখবো..
আজ আমি সামান্য কিছু ভুল করলেও নিজেকে সান্তনা দিতে পারতাম।
কিন্তু আজ কিছু না করেও সর্বোচ্চ শাস্তি পাচ্ছি।
শেষে কিনা আমার মা আমায় খারাপ ভাবলো..
ভাবছি মরে যাব। জাহান্নামের আগুন ও আমার অপমান এর আগুন কে ছাড়াতে পারবেনা।
আমি মরে গেলে আমার মা বাবা কে ঠিক ই সমাজ বলবে মেয়ে খারাপ তাই মারা গেছে।
আমি তাদের এসব এর মাঝে রেখেও যেতে পারছিনা।
কিছুক্ষন পর মা আসলো আমার রুম এ।
-লুবনা চল..
আমি: কই?
চল তুই....
আমার হাত ধরে নিচে ইকবাল এর বাসায় নিয়ে গেল..
ইকবালের জ্বর টা মনে হয় বেড়েছে। চোখ লাল রক্তের মতন।
কিছুটা অপমানেও বেড়েছে।
সে মাকে দেখে মাথা নিচু করে আছে।
মা ওর হাত ধরে বলছে,বাবা আমার মেয়েকে তুমি বাঁচাও বাবা।
ইকবাল: কাকি কি করছেন...বসেন শান্ত হয়ে।আসলে আপনি যা ভাবছেন তা কিছুনা।
মা: বাবা ঘটনা আর ভাবার পর্যায়ে নেই।
আমি দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাড়িয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইলাম।আমার ইচ্ছে করেনা আর প্রতিবাদ করতে।
মুখ দিয়ে সব শব্দ ই বিলীন হয়ে গেছে।এখন কেউ মেরে ফেললেও কাঁদতে পারবো না আমি।
অসাড় হয়ে গেছি।
ইকবাল: কাকি আমি কি করবো বলেন?
এখন ই বাসা ছেড়ে যাব?
মা: না বাবা..দেখো আমার মেয়ে ভালো থাকুক তা ওর ফুপু বা ফুপাতো ভাই চায়না।
আমার মেয়ের কপালে যা জুটল এতে ওর বিয়ে দিতে পারবো না আর।
এখন আমি বলে ফেলেছি তুমি ওর স্বামী পরে এটা জানাজানি হলে আমায় এলাকা ছাড়া করবে।নিজেদের বাড়ি ছেড়ে কই যাব বাবা?
মায়ের মুখ দেখে কি অসহায় লাগছে।আমায় নিয়ে মা কি বিপাকেই না পরে গেছে..
এর চেয়ে মেরে ফেললেই তো সব ঝামেলা শেষ...
ইকবাল: কাকি আমি কি করলে আপনি খুশি হন বলেন..
আমি রুবেল এর কাছে গিয়ে ক্ষমা চাইবো? আপনি বললে চাইবো...
মা: না বাবা,তুমি লুবনা কে বিয়ে করো তাহলে সব ঝামেলা শেষ...
আমি: মা...
মা আমার দিকে তাকালইনা..
ইকবাল: কাকি আমার বাবা অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা করান।
আমি ই বাসার বড় ছেলে বাবা জানলে মরে যাবে।
মা: আমি তাদের বলবো.
ইকবাল: তাছাড়া লুবনাকে বিয়ে করার আমার যোগ্যতা নেই।
আর ওর ও একটা মতামত আছে।
মা: ও কি বলবে..মানসম্মান আগে।
ইকবাল আমার দিকে তাকালো..
এই সেই ছেলেকে আমি তাচ্ছিল্য করতাম আজ তার কাছে আমাকে বিয়ে করার জন্য আকুতি জানাচ্ছে আমার ই মা..
মাঝে মাঝে বাস্তব খুব কঠিন হয়ে যায় যা সিনেমাকেও হার মানায়।
হায়রে সমাজ!তুমি সব পারো...
আমি কোন প্রতিবাদ করছিনা।আমার কপালের উপর সব ছেড়ে দিছি।
একমাত্র মেয়ে আমি,কি হত আমায় সারাজীবন অবিবাহিত রাখলে!
নাকি জন্ম মানেই বিয়ে করতে হয়!
একটা সময় আমার মত ছাড়াই আমার বিয়ের কার্যক্রম শুরু হয়।এর মাঝে ইকবাল অনেকবার আমার সাথে কথা বলতে চাইলেও আমি বলিনি।ইচ্ছে করেই বলিনি।
ইকবাল ওদের বাসার মানুষকে কি জানিয়েছে তা আমি জানিনা তবে যতদূর জানি তারা মেনে নেয়নি।
না মানার ই কথা...
১৬ই জুলাই,শুক্রবার আমার বিয়ের দিন ধার্য করা হয়।
একদম ঘরোয়া ভাবে আমার বিয়ের অনুষ্ঠান হয়।
এমন টা আমার প্রত্যাশায় ছিলনা।অনেক আগ থেকেই বিয়ে নিয়ে পুষে রেখেছিলাম অনেক কিছু।
দিনটা আমার কাছে এমন ভাবে ফিরে আসবে তা আমি কল্পনাও করিনি।
শুনলাম ইকবাল এর বাড়ি থেকে কেউ আসেনি।
ইকবাল এর কয়েকজন বন্ধু আমার বাবা মিলে মসজিদ এ গেল।
আমি অপেক্ষা করছি আমার বিয়ের।কি অদ্ভুত তাইনা।
সবাই মিষ্টি নিয়ে এসে বললো বিয়ে হয়ে গেছে।
কল্পনা গুলি এমন ছিলনা আমার।লাল শাড়ি পরে কবুল বলার স্বপ্ন ছিল বহু আগের ইচ্ছে..
কিন্তু বাস্তবে কবুল বলাও দরকার নেই মেয়েদের।
আচ্ছা কবুল বললেও কি মন থেকে বিয়ে করা হয়!
মনের অনিচ্ছা থাকলে সে বিয়ে কি করে বৈদ্ধ হয় আর সেই বিয়েকে কেন্দ্র করে কি করে দিনের পর দিন এক ছাদ এর নিচে থাকে?
তখন তো কোন রুবেল বিচার করতে আসেনা।
আসলে রুবেল এর মতন ছেলেরা পারে কেবল ভালো কে খারাপ করে দেখতে। তাদের সাহস নেই প্রতিবাদ করার...
যে মানুষগুলি কয়েকদিন আগে রাতে তিরস্কার করেছে তারা আজ আমাদের বিবাহিত জীবনের মঙ্গল কামনা করছেন।
মানুষখুব তাড়াতাড়ি রূপ বদলাতে পারে।
আমি সেদিনের পর থেকে কারো সাথেই কথা বলিনা..
এক ধাক্কায় অনেকটা সাবলীল লাগছে নিজেকে।
রাতে ইকবাল আর ওর বন্ধুরা আমাদের বাসায় রইলো।
ইকবাল কে আমার রুম এ শুতে দিল মা।
মাকে অনেক খুশি দেখাচ্ছে।খুশি হবার কারন আমি বুঝতে পারছিনা।
আর বাকিদের মতন আমার বাসর ঘর ফুলে সাজানো হয়নি..
শুধু নতুন বিছানার চাদর দেয়া হয়েছে।
বাসর দিয়ে অবশ্য কি বা হবে,বাসর ঘরে যার সাথে চলার শুরুর সাক্ষী, সেই চলার সাথী ই তো আমার অপছন্দের।
আমি বাকি নতুন বউয়ের মতন বিছানার এক কোনে লজ্জা মুখ নিয়ে বসে রইলাম না।জানালার পাশে দাড়িয়ে আকাশ দেখছি...
এমন সময়ে মা আসলো আমাদের কক্ষে..
ইকবাল বসা থেকে উঠে দাড়ালো..
মনে হয় ক্লাস রুমে এ শিক্ষক এসেছে আর ইকবাল ছাত্র..
মা: ইকবাল ব্যস্ততায় তোমার সাথে কথা বলা হয়নি..
ইকবাল: জ্বি কাকি বলুন।
মা হেসে বলে এই ছেলে এখনো কাকি কি?
ইকবাল চুপ করে আছে।
মা: ইকবাল লুবনা আমাদের একমাত্র মেয়ে।আমরা ওর কোন আবদার অপূর্ন রাখিনি।
এই যে বাড়ি তা তো ওর ই আর সেই সুবাদেই তোমার..
আমি আর ওর বাবা চাই আমাদের মেয়ে আরো কয়েকবছর এখানে থাক।কি ই বা বয়স ওর! পড়াশোনা শেষ করে শ্বশুর বাড়ি যাক। আর তোমার মা বাবা ও তো কেউ আসলেন না তাদের কাছে কি করে মেয়েকে পাঠাই।
তুমিও থাক এখানে। তারপর সুযোগ-সুবিধা বুঝে যাবা।
দুজন ই পড়াশোনা টা করো ভালোকরে।
ইকবাল: কাকি...ও মা, আসলে আমার কাল একটু বাড়ি যেতেই হবে..
বাবা রাগ করে আছে আমার উপর।আমার যেতেই হবে।
মা: আচ্ছা তুমি যাও। কিন্তু লুবনা থাক...
এই বলে মা আমার কাছে এসে আমার মাথায় হাত রেখে বলছে ঘুমিয়ে পর।
মা চলে যাবার পর ইকবাল আবার বসে বসে ঝিমাচ্ছে।
আচ্ছা উনি কি পালাবে?
পালানোর ই কথা..
উনি পরেছে মহা অশান্তিতে।
আমি ইকবাল এর পাশে গিয়ে বললাম,আমাকে নিবেন আপনাদের বাড়ি?
ইকবাল হতভম্ব হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
আমি: কি নিবেন না?আমি শ্বশুর বাড়ি আমি যাবনা?
ইকাবাল আমার এ আচরনে ভয় পেয়েছে হয়তো...
যদি নিজের বাসায় থাকার জন্য বিয়ের ষ্ট্যাম্প লাগিয়ে থাকতে হয় তাহলে শ্বশুরঘরে যাওয়াই ভালো..
আমি ইকবাল এর হাত ধরে ওর পায়ের কাছে বসে কেঁদে দিলাম,প্লিস আমাকে নিয়ে যান।
আমার রাগ ছিল আমার উপর,আমার রাগ ছিল আমার মায়ের উপর।এখন আমার উপর ইকবাল এর অধিকার সবার আগে তাই মাকে আমি আর জয়ী হতে দিচ্ছিনা।
ইকবাল আমার হাত ধরে উঠিয়ে বলছে,কি করছো লুবনা...কাঁদছো কেন?
বিয়ে যেহেতু করেছি নিব তো অবশ্যই তবে তুমি এখানেই ভালো থাকবে।
আমি: না আমার এখানে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়।আমি এ ঘর থেকে বের হতে চাই।
ইকবাল: আচ্ছা যাবে।
ইকবাল কিছুক্ষন পর বন্ধুদের সাথে ঘুমাতে গেল।
আর আমি সারারাত বসে-দাড়িয়ে কাটিয়ে দিলাম।কি যেন হারয়েছে আমার আর তার ই হিসাব মেলাচ্ছি।
আযান দিতেই ইকবাল আমার বাবা আর ওর বন্ধুদের নিয়ে গেল নামাজ পড়তে আর যাবার সময় আমাকেও বললো পারলে যেন নামাজটা পরে নেই।
সকাল ৭টা, আমি ব্যাগ গুছিয়ে বসে আছি।
মা নাস্তা দিতে এসে দেখে ব্যাগ..
মা: কিরে লুবনা ব্যাগ কিসের..?
আমি: আমার।
মা: কেন?
আমি: ইকবালের সাথে তাদের বাড়ি যাব। মা কি বলি শুনছো বলে কাঁদতে কাঁদতে বাবাকে ডাকতে গেল।
বাবা বেচারা আজকাল আমার কাছে আসেইনা
হয়তো আমার দিকে তাকাতে লজ্জা পায় নয়তো কষ্ট হয়।
বাবা আসলো আমার কাছে...
আমার পাশে বসে কাঁন্না গলায় বলছে,কিরে মা পাগলামি করছিস কেন?
আমি বাবাকে জড়িয়ে কাঁন্না করে দিলাম।বাবাও আর নিজেকে সামলাতে পারলো না।
এই তো সেদিন বাবার পেটের উপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে পরেছি আর আজ বাবাকে কাছেও পাইনা আমি।
আমি: বাবা আমি আবার আসবো..
আমার মনে হয় ইকবাল পালাবে..
যদিওবা এটা মিথ্যে সান্তনার জন্য বলেছি যাতে আমাকে যেতে দেয়।
ইকবাল যে পালানোর নয় তা আমি বুঝে গেছি।
পরে মা-বাবা রাজি হলো..
আমি এবং ইকবাল দুজন ই যাত্রা শুরু করলাম।
বাস এ বসে ইকবাল আমায় বলছে: তুমি ভেবেছো আমি পালিয়ে যাব?
আমি অবাক হয়ে ওনার দিকে তাকালাম..
তারমানে আমি বাবাকে যখন বলেছি, তখন সে শুনেছে..
আমি আর উত্তর দিলাম না,কিছু প্রশ্নের উত্তর জানা থাকেনা বা জানলেও বলার ইচ্ছে হয়না....
যাকে আমি আমার কেউ ভাবিনা তার ভুল ভাঙানোর আমার কিসের দায়..!

Comments
Post a Comment